বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বিমানবন্দর থেকে নয়, বরং তার বাসার পাশের একটি শপিং মল থেকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তার পরিবার।
পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ১২ জুন বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় তার এক বন্ধু ও ব্যবসায়িক সহযোগী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক সংসদ সদস্য তাকে বাসার কাছের একটি শপিং মলে দেখা করার জন্য ফোন করেন। সেখানে পৌঁছানোর পর আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া দুবাই পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরিবারের দাবি, ঘটনাস্থলে ওই সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন।
তবে এ বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগের স্বাধীন কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা জেনেছেন যে স্থানীয়ভাবে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশ পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে জারি করা রেড নোটিশের তথ্যের কারণেই তাকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, আটক করার পর দুবাই পুলিশ তার ভিসার বৈধতা, দেশটিতে অবস্থানের উদ্দেশ্য এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে যাচাই করে। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক এবং তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল নোটিশ রয়েছে—এ তথ্য বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।
আইনজীবী নিয়োগ, জামিন আবেদনের প্রস্তুতি
পারিবারিক সূত্রের দাবি, বেনজীর আহমেদের পক্ষে দুবাইয়ে একজন স্থানীয় আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে চলমান মামলাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্রও আইনজীবীর পরামর্শে দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছে।
দুবাইয়ে টানা সরকারি ছুটির কারণে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত ছিল। শুক্রবার আংশিক কার্যক্রমের পর শনিবার ও রোববার সাপ্তাহিক ছুটি এবং সোমবার ইসলামিক নববর্ষ উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকায় আদালতের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করা হলে তার আইনজীবী জামিনের আবেদন করতে পারেন। আর আদালতে হাজির করা না হলে প্রসিকিউশন দপ্তরে তার পক্ষে প্রয়োজনীয় আবেদন দাখিল করা হবে।
বাংলাদেশে ফেরত আনার চেষ্টা চলছে
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেছেন,
“সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আমাদের জানানো হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সদর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।”
পুলিশ সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে বেনজীর আহমেদ দুবাই পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন এবং ইন্টারপোল নোটিশের কারণে বিষয়টি বাংলাদেশকে অবহিত করা হয়েছে।
তবে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আটকটি ইন্টারপোলের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ কি না, কিংবা অন্য কোনো বিষয় এতে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়। পাশাপাশি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠানো সম্ভব হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সহজ নয়
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কেবল ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকলেই কোনো ব্যক্তিকে দ্রুত প্রত্যর্পণ করা যায় না। প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দুই দেশের আইন, পারস্পরিক চুক্তি, মামলার প্রকৃতি এবং আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তার মতে, বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বেনজীর আহমেদকে ফেরত চাইলে দুবাইয়ের প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাগুলোর নথি, অভিযোগের ভিত্তি এবং আইনি অবস্থান পর্যালোচনা করবে। এ ছাড়া পরিচয় বা ভ্রমণসংক্রান্ত কোনো জটিলতা থাকলেও তা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালতের ওপর নির্ভরশীল
বর্তমানে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা ও অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, দুবাইয়ের আদালত ও প্রসিকিউশনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত, পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের ওপরই তার জামিন, আটকাবস্থা এবং সম্ভাব্য প্রত্যর্পণের বিষয়টি নির্ভর করবে।
দুবাইয়ে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরই এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যেতে পারে।