ঢাকা    শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
দৈনিক হৃদয়ে বাংলাদেশ

এক ভাগে দুজনের কুরবানি— সহিহ হবে, নাকি নষ্ট হবে পুরো কুরবানি?

কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার এক অনন্য ইবাদত। প্রতি বছর জিলহজ মাস এলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে কুরবানির প্রস্তুতি শুরু হয়। কেউ একা, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শরিক হয়ে গরু বা মহিষ কুরবানি করেন। কিন্তু অনেক সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়— একটি ভাগে কি দুই বা তিনজন মিলে শরিক হওয়া জায়েজ? অর্থাৎ, গরুর এক-সপ্তমাংশে একাধিক ব্যক্তি অংশ নিলে কুরবানি আদায় হবে কি? ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য শুধু নিয়তই যথেষ্ট নয়; বরং তা শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হওয়াও জরুরি। তাই কুরবানির শরিকানা সম্পর্কিত এই গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাটি জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য প্রয়োজন। কুরবানি: ত্যাগ ও আনুগত্যের মহান ইবাদত কুরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করার মাধ্যমে মুমিনরা ইবরাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মৃতি ধারণ করেন। তবে এই ইবাদত শুদ্ধভাবে আদায় করতে হলে শরিয়তের নির্ধারিত বিধান মেনে চলা আবশ্যক। বিশেষ করে বড় পশুতে শরিক হওয়ার নিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। বড় পশুতে শরিক হওয়ার মূল বিধান ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা একজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করা যায়। আর গরু, মহিষ ও উটের মতো বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি শরিক হতে পারেন। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—প্রত্যেক শরিকের অংশ যেন কমপক্ষে পূর্ণ এক-সপ্তমাংশ (১/৭) হয় এবং প্রতিটি ভাগ কেবল একজন ব্যক্তির পক্ষ থেকেই হতে হবে। হাদিসের দলিল হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত—  نَحَرْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ عَامَ الْحُدَيْبِيَةِ الْبَدَنَةَ عَنْ سَبْعَةٍ وَالْبَقَرَةَ عَنْ سَبْعَةٍ ‘আমরা হুদায়বিয়ার বছরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে কুরবানি করেছি। একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরুও সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছি।’ (মুসলিম ১৩১৮-৩০৫৫) এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারবেন। তবে প্রত্যেকের অংশ পৃথক ও পূর্ণ হওয়া শর্ত। আরও পড়ুনআরও পড়ুনহালাল হলেও পশুর যেসব অংশ খেতে অপছন্দ করতেন নবীজি (সা.) এক ভাগে একাধিক ব্যক্তি শরিক হওয়া কেন বৈধ নয়? কুরবানি একটি নির্ধারিত সীমার ইবাদত। শরিয়ত বড় পশুর এক-সপ্তমাংশকে একজন ব্যক্তির জন্য ন্যূনতম অংশ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। তাই যদি দুই বা তিনজন ব্যক্তি মিলে একটি ভাগ গ্রহণ করেন, তাহলে প্রত্যেকের অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হয়ে যায়। এ অবস্থায় শরিয়তের শর্ত পূরণ হয় না। ফকিহদের অভিমত হলো—যদি কোনো একজন শরিকের অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হয়, তাহলে ওই পশুর কারও কুরবানিই সহিহ হবে না। কারণ, প্রতিটি অংশে স্বতন্ত্র মালিকানা থাকা আবশ্যক। ফিকহবিদদের স্পষ্ট মতামত নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহ গ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে— ‘গরু বা উটের প্রতিটি ভাগে একাধিক ব্যক্তির শরিক হওয়া বৈধ নয়। যদি কোনো শরিকের অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হয়, তবে কোনো শরিকেরই কুরবানি সহিহ হবে না।’ (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ২০৬, ২০৭; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া ৫/৩০৪-৩০৫) এ ছাড়া হাম্বলি মাজহাবের বিশিষ্ট ফকিহ ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন— ‘এক পশুতে সাতজনের বেশি শরিক হলে কুরবানি সহিহ হবে না।’ (আল-মুগনি ১৩/৩৯০) আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলে করণীয় কী? অনেক সময় পরিবারের কয়েকজন সদস্য বা ভাই মিলে একটি ভাগের টাকা জোগাড় করেন। কিন্তু সরাসরি যৌথভাবে এক ভাগ নেওয়া বৈধ নয়। তবে শরিয়তসম্মত একটি সুন্দর সমাধান রয়েছে। ধরা যাক— ‘তিন ভাই মিলে একটি ভাগের টাকা সংগ্রহ করেছেন। সেক্ষেত্রে তারা সেই অর্থ একজন ভাইকে ‘হেবা’ (উপহার) হিসেবে দিয়ে দিতে পারেন। এরপর ওই ব্যক্তি নিজের নামে পূর্ণ এক ভাগে শরিক হবেন। এতে অন্তত একজনের কুরবানি সহিহভাবে আদায় হবে এবং অন্যরা সহযোগিতার সওয়াব পাবেন। পরে সবাই মিলে গোশত ভাগ করে নিতে পারবেন।’ (খুলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩১৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৬) কুরবানির ক্ষেত্রে যে বিষয়টি মনে রাখা জরুরি > বড় পশুর প্রতিটি ভাগ কেবল একজন ব্যক্তির নামে হতে হবে। > এক ভাগে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি যৌথভাবে মালিক হলে কুরবানি সহিহ হবে না। > সাতজনের বেশি শরিক করা যাবে না। > শরিয়তের বিধান মেনে কুরবানি আদায় করাই ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত। কুরবানি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আল্লাহর নির্দেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। তাই এই ইবাদত আদায়ের ক্ষেত্রে আবেগ বা প্রচলিত রেওয়াজ নয়, বরং শরিয়তের সঠিক বিধান অনুসরণ করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব। এক ভাগে একাধিক ব্যক্তি শরিক হওয়ার মাধ্যমে যদি কুরবানিই সহিহ না হয়, তাহলে সেই ত্যাগের উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। তাই কুরবানির আগে মাসআলা জেনে নেওয়া, আলেমদের পরামর্শ গ্রহণ করা এবং বিশুদ্ধ নিয়তে শরিয়তসম্মতভাবে ইবাদত আদায় করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ আকিদা, সঠিক মাসআলা ও আন্তরিক নিয়তের সঙ্গে কুরবানি আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।

এক ভাগে দুজনের কুরবানি— সহিহ হবে, নাকি নষ্ট হবে পুরো কুরবানি?